তোপখানা, একটি মহল্লার নাম

0

সিলেট আরো দুইটি নামে পরিচিত, সিলহট অথবা শ্রীহট্ট।
সেই সিলেটের সুরমা নদীর পাড়ে এই তোপ খানা মহল্লাটি যেখানে আমি শৈশবের ছয়টি দুরন্ত বছর কাটিয়েছি। তোপখানা সিএনবি কমপাউন্ড এ আমাদের বাসা ছিল, ওখানে আরো দুইটি ইঞ্জিনিয়ার এর বাসা ছিল, এছাড়াও আরো কতগুলো ছোট ছোট বাসা ছিল অধস্তন অফিসারদের জন্য।ওই মহল্লা ও আশেপাশের মহল্লা গুলি স্মৃতি আমার মনের গহিনে এখনো জ্বলজ্বল করে ভাসমান। *কম্পাউন্ডের ভিতরে আমরা ১০-১২ জন ছেলে-মেয়ে বিকেলবেলা দৌড়াদৌড়ি করতাম, গোল্লাছুট খেলতাম। সিরু নার্গিস রেখা ফুয়াদ তৈমুর ওআরো অনেকে। পকেটে সবসময় মার্বেল থাকতো, মার্বেল খেলার একটা নেশা ছিল।তবে একটু বড় হয়েছি যখন সম্ভবত ক্লাস সিক্সে, দৌড়াদৌড়ি খেলা বাদ দিয়ে ঘুড়ি উড়াইতে মজা পেতাম বেশি।নিজেরাই মাটির হাড়িতে ঈট বিছিয়ে চুলা জ্বালিয়ে লেই তৈরি করতাম। তারপর সুতাতে মাঞ্জা দিতাম।

*ঘুড়ি আকাশে উড়তেছে, অন্য ঘড়ির সাথে কাটাকাটি খেলছি, সে এক রোমাঞ্চকর ব্যাপার-স্যাপার।*


আমাদের কম্পাউন্ডের সামনেই একটি পুকুর ছিল তারপরে মেইনরোড। এবং তার পরেই সুরমা নদী।
অপূর্ব মায়াবী পরিবেশে আমার ছোটবেলাটা কেটেছে তাই হয়তো আমি একটু ভাবুক প্রকৃতির হয়ে পড়েছি এবং জীবনের শেষ অঙ্কে লেখালেখি করতেও পারছি।


এক পাশে ছিল হিন্দু পাড়া সেখানেও একটি পুকুর ছিল এবং একদিন সকালে হইচই শুনে সেই পুকুরের দিকে ছুটলাম, শুনলাম,ক্লাস টেনের একটা ছাত্র সাঁতার কাটতে নেমেছে, উঠতেছে না। যথারীতি দামকল চলে এলো, ডুবুরিরা পুকুরে ডুব দিয়ে, ওই ডুবন্ত ছাত্রটিকে তুলে আনলো। তার মুখ দিয়ে লালা পড়ছিল, ডুবুরি তাকে কাঁধে করে ঘুরাতে লাগলো কিন্তু বাঁচাতে পারে নাই।


পুকুরের অন্য পাশে ছিল একটি ছোট মাঠ সেখানে আমার বন্ধু তৈমুরের বাসা ছিল। সম্ভবত ক্লাস সিক্সে আমরা সবাই মিলে টাকা জমালাম এবং যখন ৩ টাকা হল তখন ছুটলাম রংমহল সিনেমা হলের কাছে একটি স্টোরে ফুটবল কিনার জন্য। *৩ টাকায় ফুটবল কিনে হই হই রই রই করে মহল্লায় ফিরে আসলাম যেন যুদ্ধ জয় করে ফিরে এসেছি। ছুটির দিনে সকালে ফুটবল খেলতাম, তা না হলে বিকালে প্রতিদিনই ফুটবল খেলতাম। আমি সেন্টার ফরওয়ার্ডে ভালো খেলতাম কারণ ভালো কেরি ক্যাচার জানতাম। *আমি সিলেট গভমেন্ট হাই স্কুলে পড়তাম অবশ্য এর আগে আমি দুর্গা কুমার পাঠশালায় পড়েছিলাম দুবছর।*
স্কুলের বিশাল মাঠে ফুটবল খেলতাম এবং কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করতাম।


মহল্লার আর আরেক পাশে ছিল পুলিশপাড়া ওখানে একটি থানা ছিল, ওই থানার পাশে প্রায় আমি ঘুরঘুর করতাম মজা দেখার জন্য। দেখতাম আসামি ধরে আনার পরে একটি মাঝারি লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকতো তারপর একটি বদ্ধ ঘরে ঢুকিয়ে দিত। একবার ছেলেরা ধরা পড়েছিল, থানার আশেপাশে ভিড় জমে গিয়েছিল ছেলে ধরা দেখার জন্য। পুলিশ এক পর্যায়ে ছেলে ধরাকে ভেতর থেকে এনে সবাইকে দেখালো। লুঙ্গি পরা একটা মধ্যবয়স্ক যুবক।


থানের পাশেই ছিল আমার স্বপ্নের ইউএসআইএস লাইব্রেরি। ক্লাস থ্রিতেই আমি ওটার মেম্বার হয়েছিলাম হেডমাস্টারের সাইন নকল করে। বিকেল বেলা বা সন্ধ্যাবেলা প্রায় সময় ঐ লাইব্রেরীতে গিয়ে বই পড়তাম। দুইটি বইয়ের কথা এখনো মনের পটে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। হতভাগ্য সৈনিক ও দুই দিগন্ত।


প্রতি রবিবার ইউ এস লাইব্রেরীতে সিনেমা দেখানো হতো বিশেষত ডকুমেন্টারি। সিনেমা হলটি ছোট ছিল তারপরেও আমাদেরকে সামনের সিটে বসে দেখার সুযোগ করে দিত। কিছু কিছু ডকুমেন্টারি কথা এখনো মনের পর্দায় ভেসে ওঠে।
ইউএসআইএস লাইব্রেরির পাশেই ছিল একটি থিয়েটার হল। ওখানে একবার ফেরদৌসী রহমান ও আরো অনেকেই গান গেতে এসেছিল। আমাদের তিন ভাইয়ের গায়ে ছিল সদ্য কিনা পাকিস্তানি ব্লেজার। ভালো পোশাকের জন্যই আমাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দিল। এখানে শেখ সাদীর গল্পটা মনে পড়ে যায়।


থিয়েটারে একটু সামনেই সেই লাল ঘড়ি ঘর। তার পাশেই সেই বিখ্যাত কিনব্রিজ।
প্রতি সোমবারে তোপখানা মহল্লার রাস্তার উপরে বাজার বসতো। খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য জিনিস এরকমই সমাহার। আবার কিছু কিছু ছোটখাটো খেলারও ব্যবস্থা ছিল।


সুরমা নদীতে অনেক নৌকা ভিড়ে থাকত নারকেল বুঝাই। পাচ আনায় একটা মাঝারি সাইজের নারকেল পাওয়া যেত। ঘাটে একবার সিএনবির একটি বড় স্টিমার এসেছিল। আমরা সেই স্টিমারে চড়ে সুরমা নদী ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলাম।
বছরে একবার নৌকা বাইচ হত, এক অপূর্ব দৃশ্য। ১০-১২ টা নৌকা তালে তালে ছন্দে ছন্দে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করত। কোন নৌকার মাথাটা ছিল ময়ূর, কোন নৌকার মাথাটা ছিল প্রজাপতি এরকম।

আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মহল্লার নাম তোপখানা এবং তার আশেপাশের অনেক স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি।
*লেখার তারিখঃ এপ্রিল ২০২৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *